ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি। প্রতিবছর রমজানের শেষে ঈদ আসলে আনন্দ, খুশি আর মিলনের ঐকতান বাজে। সর্বত্র একটি বার্তাই পৌঁছে যায় যে, সিয়াম সাধনার দুঃখ কষ্ট অনাহার ক্লিষ্টতা দূর করে আনন্দ উল্লাসে ভরা হাসির একটি দিন, ঈদের দিন। সব ঘরে ঘরে আনন্দ উল্লাস বয়ে যায়। মুসলমান সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসব-আনন্দ এই দিনটিকে ঘিরে। এই দিনে সমাজের ধনী- নির্ধন সবাই সব রকম ভেদাভেদ ভুলে ঈদের আনন্দ সমানভাবে ভাগ করে নেয়। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সব দেশে স্থান কাল ও সময় ভেদে উৎসবটি সাড়ম্বরে আনন্দ পূর্ণভাবে উদযাপিত হয়। বছরে মুসলিমদের দুটি জমকালো উৎসবের মধ্যে ঈদ অন্যতম। ঈদ আসে কঠিন সাধনায় কঠোর সংযমের মাধ্যমে পুরো ৩০ দিন রমজানের তিনটি অধ্যায় অতিক্রম করে। যথাক্রমে : রহমত, মাগফেরাত এবং নাজাতের সিঁড়ি অতিক্রম করে হিজরি মাসের শাওয়ালের চাঁদ দেখার মধ্য দিয়ে।
রমজানের শেষদিন সন্ধ্যায় শাওয়ালের চাঁদ দেখা যায়। মুসলিম সকল শ্রেণির নর-নারী আবাল বৃদ্ধ বিতান মনে আনন্দের ঢেউ বয়ে যায়। আগামীকাল ঈদ উৎসব এটা তাদের মনকে দারুণভাবে পুলকিত আনন্দিত ও আন্দোলিত করে।
একটু বিশ্লেষণ করে বলা যায়, এই মাসে মাগফেরাতের ২০শে রমজান অতিক্রম এর পর রমজানের শেষ দিন পর্যন্ত অনেকেই এতেকাফে বসেন এর মধ্য দিয়ে অনেক পুণ্য ও সওয়াব অর্জন করা যায়। রমজান মাসের শেষ পর্বের ১০ দিনের ২১, ২৩, ২৫, ২৭, ২৯ বেজোড় রাত্রিগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ ইসলামী মনীষীদের মতে, ২৬শে রমজান দিবাগত রাতে শবে কদর অনুসন্ধান করা হয়। এই রাত্রিটিতে মুসলিম নর-নারী রাত জাগরণের মাধ্যমে পাপ পঙ্কিলতা মুক্তির জন্য জিকির আস্কর করে অতিবাহিত করেন। এই পুণ্য রজনীর সম্মানের বা কদরের রাতে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনার মাধ্যমে বান্দারা তাদের গুনাহের জন্য স্রষ্টার দরবারে ক্রন্দন করে প্রার্থনা করেন। কারো বা রয়েছে অভাব অসুবিধা, কারো বা রোগ- শোক নিরাময় প্রার্থনা, বিভিন্ন বিষয়ে বিভিন্ন মানুষ দুনিয়ার মালিকের কাছে ফরিয়াদ করেন। এই রাত্রি হাজার মাসের শ্রেষ্ঠ, হাজার রাতের শ্রেষ্ঠ রজনী।
রমজানের ৩০ তারিখ দিবাগত রাত্রিতে স্বয়ং রাব্বুল আলামিন তার প্রিয় বান্দাদের পুরস্কারের জন্য ফেরেশতাদের বলতে থাকেন, সারা মাসব্যাপী রোজা, সেহরি ও তারাবির মাধ্যমে, ইফতারের মাধ্যমে আমার যে বান্দারা মজদুর হিসেবে ইবাদত প্রার্থনার মাধ্যমে আমার নির্দেশ পালন করতে কষ্টকর ভাবে কাটিয়ে দিলো, ওদের কী করা উচিত? ফেরেশতারা তখন তাদের পুরস্কারের কথা বলেন! রাব্বুল আলামিন তাদেরকে পুরস্কারের জন্য ঈদের দিন প্রত্যুষে ফেরেশতাদের পৃথিবী বক্ষে প্রেরণ করেন। তারা বিভিন্ন অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়ায়, সবাই সম্মিলিতভাবে যখন ঈদগামুখী হয়, মালিক তাদের জীবনের সকল গুনাহ মাফ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যান। সারা বছরের জন্য তাদেরকে গুনাহমুক্ত বান্দায় পরিণত করেন। তাদের সৎ উপার্জন, ভালো জীবন যাপন এবং পরকালের জীবন সম্পর্কে সওয়াবের মাধ্যমে রহমত বর্ষণ করেন।
ঈদের দিনের মুখ্য উৎসব শুধু ঈদগাহে নতুন পোশাক পরে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং ঈদের নামাজ শেষে পরস্পর আন্তরিক মিলনের জন্য কোলাকুলি করেন, করমর্দন করেন। প্রত্যেক বাড়িতে সাধ্য অনুযায়ী ভালো খাবারের আয়োজন করা হয়। নিজেরা খেয়ে এবং প্রতিবেশী ও মেহমানদের আপ্যায়নের মাধ্যমে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়া হয়।
ঈদের দিন সকালে রীতি অনুযায়ী প্রত্যেক পরিবার স্নান করে ময়দানে নামাজ পড়তে যাওয়ার জন্য নতুন পোশাক পরে প্রস্তুত হন। তবে তার আগে রেওয়াজ অনুযায়ী ছোটরা বড়দেরকে সালাম করার মাধ্যমে ঈদ সালামি পেয়ে দারুণভাবে খুশি হয়। বাংলাদেশি প্রত্যেক নাগরিকের শৈশব- বাল্য- কৈশোর হাতড়ালে মনে অনেক স্মৃতির ডালি উন্মোচিত হয়। বড়রা ছোটদেরকে সালামি দেওয়ায় পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় হয়। ঈদের আনন্দ বেশ জমজমাট হয়। পুরো দিনটা আমন্ত্রণ রক্ষা করা, বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-স্বজনদের সাথে আনন্দ বিহারে কেটে যায়। আত্মীয় অনাত্মীয় আপনজন সজন প্রিয়জন সবার সান্নিধ্যে ঈদ হয়ে ওঠে এক আনন্দের উৎসব।
ঈদের আগের রাতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পুরস্কারের রাত হিসেবে নামকরণ করেছেন। জিন এবং ইনসান অর্থাৎ জ্বীন এবং মানব জাতি ছাড়া সবাই ঈদের দিন সকালে আল্লাহর জমিনে ফেরেশতাদের হাক-ডাক করা শুনতে পায়। সারা সকাল জুড়ে চলে আল্লাহর বান্দাদের ইহকাল ও পরকালের পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা। সারা মাস রোজা ও তারাবির নামাজের মাধ্যমে যে কষ্ট হয়েছে, তার জন্য সন্তুষ্ট হয়ে দুনিয়ার মালিক তার ইহকাল এবং পরকালের জীবনের পথ সহজ করে দেন।
উৎসবের এই দিনে আমাদের আশেপাশে যে সমস্ত নিঃস্ব নিঃসম্বল, দুঃস্থ অসহায়, নর-নারী আছে, এতিম শিশু আছে, তারাও যাতে হাসিমুখে উৎসব পালন করতে পারে, তার জন্য গরিবের হক- তাদের প্রাপ্য জাকাত, ফেতরা আমরা সঠিকভাবে আদায় করলে বা দান করলে, গোটা ঈদের দিনটা খুশি আর আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
আমাদের বাংলাদেশের পারিবারিক সামাজিক জীবনে বছরে একবার আমরা এই দিনটির জন্য গভীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করি। এই দিনটিতে বিত্তবানদের বাড়িতে যেমন নানা রকম আনন্দ-কোলাহল উৎসব চলে, হতদরিদ্রদের জীবনেও ঈদ অবশ্যই আনন্দ হাসির বার্তা বয়ে আনে। গরিবরা বিত্তবানদের কাছে কুড়িয়ে যা কিছু পায়, তাতে তাদের দিনটিও অনেকদিন অর্ধাহার অনাহারের পরও সামান্য একদিন হলেও সচ্ছলতার মুখ দেখে।
মুসলিম সম্প্রদায়ের হাজার হাজার বছরের পালিত সংস্কৃতির অংশ হিসেবে এই দিন ঘরে ঘরে আনন্দ এবং মিলনের উৎসব চলে যা বিশ্ব মানবতাকে দারুণভাবে সমৃদ্ধ করে।
কবি বলেছেন, “হররোজ যারা ক্ষুধায় কাতর, কণ্ঠ যাদের ক্ষীণ, আসে না যাদের নিদ, সেই হতভাগাদের দুঃখের জীবনে এসেছে কি আজ ঈদ?”- আমরা ঈদের দিনকে গরিব দুঃখীর সাথে সচ্ছল মানুষের আনন্দ ভাগাভাগির দিন হিসেবে পালন করবো এই প্রতিজ্ঞা যেন ধরে রাখতে পারি।
তবে আমাদের ঈদ উৎসবের দিনটি একশ্রেণীর কিছু অসাংস্কৃতিক যুবক-যুবতী ড্রাম বাজিয়ে, নৃত্য করে, অশ্লীল হৈ-হুল্লোড় করে, ঈদের উৎসবকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে। সে সম্পর্কে সংস্কৃতিবান শালীনতা প্রিয়দের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের হাজার বছরের ঈদ উৎসবের আনন্দ যেন উচ্ছৃঙ্খল নৈরাজ্যের মধ্যে হারিয়ে না যায়। সবার জীবনে অনাবিল সুখ, সমৃদ্ধি এবং অপার আনন্দ বয়ে যাক, আজকের ঈদের দিনে, এই শুভ প্রত্যাশা।
লেখক : অধ্যাপক, প্রাবন্ধিক, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
খুলনা গেজেট/এনএম

